তারাবির নামায
নাজমুল ইসলাম
‘তারাবিহ’ হলো ‘তারবিহাহ’ শব্দের বহুবচন। যার অর্থ হচ্ছে, ‘বিশ্রাম’। যা ‘রাহাত’ শব্দ থেকে এটি গৃহীত, যার অর্থ কষ্ট ও পরিশ্রম দূর হওয়া। মূলত ‘তারবিহাহ’ হলো সাধারণভাবে বসার নাম। তারপর রমযান রাত্রিতে প্রতি চার রাকাত পর যে বসা হয়, তা বিশ্রামের জন্য হওয়ায় তাকে ‘তারবিহাহ’ বলা হয়। পরে প্রতি চার রাকাতকেই রূপকার্থে ‘তারবিহাহ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।[1] তারাবিহ নামায হলো রমযান মাসের এমন বিশেষ নামায যেটি এশার নামাযের পর দুই দুই রাকাত করে বিশ রাকাত পড়া হয়।[2]
তারাবিহ নামাযের হুকুম
তারাবিহ নামাযের ফজিলত
হাদিসে এসেছে, عن أَبي هُرَيرَة رَضِيَ اللهُ عَنْه، قال: كان رسولُ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم يُرغِّبُ في قيامِ رمضانَ من غير أنْ يأمرَهم فيه بعزيمةٍ، فيقولُ: مَن قامَ رمضانَ إيمانًا واحتسابًا غُفِرَ له ما تَقدَّمَ مِن ذَنبِه আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের (রাতে) কিয়াম (তারাবিহ) পড়ার জন্য উৎসাহিত করতেন, তবে তাদেরকে এতে বাধ্যতামূলক আদেশ করতেন না। তিনি বলতেন: ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমযানের (রাতে) কিয়াম (তারাবিহ) আদায় করবে, তার অতীতের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।[8]
তারাবিহ নামাযের ইতিহাস
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনিয়মিতভাবে তারাবিহ নামায পড়েছেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর যুগে সাহাবায়ে কেরাম তারাবিহ পড়েছেন একা একা আবার কখনো ছোট ছোট জামাতে। আর ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. হিজরি ১৪ সালে, তার খিলাফতের প্রায় দুই বছর পর (মতান্তরে তার খিলাফতের দ্বিতীয় রমযানে) লোকদেরকে তারাবিহ নামাযে একই ইমামের পিছনে একত্রিত করেন।[9]
তারাবিহ নামাযে আযানের বিধান
পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায এবং জুমার নামায ব্যতীত অন্য কোন নামাযের জন্য আযানের বিধান নেই। তবে শাফি মাযহাবে ‘আসসালাতু জামেআ’ বলে নফল নামাযের জন্য আহ্বান করা জায়েয হলেও হাম্বলী মাযহাবে এটিকে বিদআত বলা হয়েছে।[10]
তারাবিহ নামাযের নিয়ত
মুখে নিয়ত উচ্চারণ করা উত্তম। সুন্নত, নফল, তারাবিহ ইত্যাদি যে কোন শব্দে নিয়ত করা যাবে। ‘আমি তারাবিহ নামায পড়ছি’ এমন নিয়ত মনে মনে থাকলেও নামায হবে। কেউ চাইলে এভাবেও নিয়ত করতে পারে, নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তাআলা, রাকাতাইনি সালাতিত তারাবিহ সুন্নাতি রাসূলিল্লাহি তাআলা, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার । অর্থ: আমি কেবলামুখী হয়ে দুই রাকাত তারাবিহুর সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাযের নিয়ত করছি, আল্লাহু আকবার । জামাতে পড়লে: ...ইমামের পেছনে পড়ছি, আল্লাহু আকবার।[11]
তারাবিহ নামাযের রাকাত সংখ্যা
চার মাযহাবের ফতোয়া হলো তারাবিহ নামায বিশ (২০) রাকাত।[12] ওমর রা. জামাতের সাথে বিশ রাকাত তারাবিহ চালু করেন। এর পর সাহাবা, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ীসহ পরবর্তী মাশরিক-মাগরিবের উম্মতে মুহাম্মদী জামাতের সাথে বিশ রাকাত তারাবিহ পড়ে আসছেন। তারাবিহুর নামায বিশ রাকাত হওয়ার ব্যাপারে উম্মতের ইজমা রয়েছে। আল্লামা কাসানী র. বলেন, جَمَعَ عُمَرُ أَصْحَابَ رَسُول اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ عَلَى أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ - رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ - فَصَلَّى بِهِمْ عِشْرِينَ رَكْعَةً ، وَلَمْ يُنْكِرْ عَلَيْهِ أَحَدٌ فَيَكُونُ إِجْمَاعًا مِنْهُمْ عَلَى ذَلِكَ ওমর রা. রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবীগণকে উবাই ইবনু কাব রা.-এর ইমামতিতে একত্র করেন। তিনি তাঁদের নিয়ে ২০ রাকাআত নামায পড়ান। এতে কোনো সাহাবী আপত্তি করেননি। অতএব, এটি সাহাবায়ে কেরামের পক্ষ থেকে একটি ইজমা (ঐকমত্য) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।[13] দুসূকী র. বলেন, وَقَال الدُّسُوقِيُّ وَغَيْرُهُ ওটাই সাহাবী ও তাবেয়ীনদের আমল ছিল।[14] ইবনে আবিদীন বলেন: عَلَيْهِ عَمَل النَّاسِ شَرْقًا وَغَرْبًا ওটাই পূর্ব-পশ্চিম সর্বত্র মুসলিমদের আমল হিসেবে চলে আসছে।[15] আলী আস-সাানহুরী বলেন: هُوَ الَّذِي عَلَيْهِ عَمَل النَّاسِ وَاسْتَمَرَّ إِلَى زَمَانِنَا فِي سَائِرِ الأْمْصَارِ ওটাই মানুষের সর্বজনস্বীকৃত আমল, যা আমাদের যুগ পর্যন্ত বিশ্বের সকল শহরে ধারাবাহিকভাবে প্রচলিত রয়েছে।[16] হাম্বলী ফুকাহাগণ বলেন: وَهَذَا فِي مَظِنَّةِ الشُّهْرَةِ بِحَضْرَةِ الصَّحَابَةِ فَكَانَ إِجْمَاعًا وَالنُّصُوصُ فِي ذَلِكَ كَثِيرَةٌ এ বিষয়টি মশহুর আমলের পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতেই এটি সংঘটিত হয়েছিল; অতএব তা একটি ইজমা হিসেবে পরিগণিত হয়। আর এ বিষয়ে অনেক দলিল রয়েছে।[17]
চার রাকাত পর বিশ্রাম
তারাবিহ নামাযে প্রতি চার রাকাত পর দুই রাকাত পরিমাণ সময় বিশ্রাম নেয়া মুস্তাহাব। এসময় দোয়া পড়া, জিকির করা, চুপ থাকা, ইস্তিনজা করা, নাস্তা করা সবই জায়েয।[18]
এক সালামে কত রাকাত পড়া যায়?
তারাবিহ নামাযে উত্তম পদ্ধতি হলো প্রতি দুই রাকাত পর পর সালাম ফিরিয়ে নতুন করে নামায শুরু করা। এক সালামে ৪ বা ৮ রাকাত পড়লেও তারাবিহ হবে। কেউ যদি দুই রাকাত পর পর বৈঠক দিয়ে এক সালামে ২০ রাকাত পড়ে তাহলেও তারাবিহ আদায় হবে তবে এক সালামে ৮ রাকাতের বেশি পড়া মাকরূহ।[19]
তারাবিহ নামায বসে পড়া
ওজর থাকলে তারাবিহ নামায বসে পড়া জায়েয। ওজর না থাকলে বসে পড়া মাকরূহে তানযীহী।[20] তারাবিহ নামাযে ‘মুক্তাদি বসে থেকে ইমাম রুকুতে যাওয়ার সময় দাঁড়ানো’ মাকরূহে তাহরীমী। তবে একান্ত ওজরের কারণে এমনটি করলে মাকরূহ হবে না।[21]
তারাবিহ নামাযের সময়
তারাবিহ নামাযের সময় হলো এশার নামাযের পর থেকে ফজর নামাযের পূর্ব পর্যন্ত। তারাবিহর আগে বিতর পড়ে ফেললেও ঐ রাতে তারাবিহ নামায পড়া যাবে। অর্ধ রাতের পর এশার নামায মাকরূহ হলেও তারাবিহ নামায মাকরূহ নয় বরং নফল নামাযের মতো শেষ রাতে তারাবিহ পড়া উত্তম। অলসতা ও সেহরির ব্যস্ততার কারণে তারাবিহ ছুটে যাওয়ার আশংকা থাকলে আগে পড়া উত্তম; যেমনটি আমাদের সমাজে প্রচলিত। মাগরিবের পর এশার পূর্বে তারাবিহ পড়লে তা অধিক বিশুদ্ধ মতে তারাবিহ হিসেবে গণ্য হবে না; বরং নফল হিসেবে গণ্য হবে। তবে এশার পর তারাবিহ পড়ার সময়/সুযোগ না থাকলে এশার আগে পড়ে নিলেও আশা করা যায় তা তারাবিহ হিসেবে গণ্য হবে। কেননা তারাবিহ হলো কিয়ামুল লায়ল আর মাগরিব থেকে ফজর পুরোরাই রাতের অন্তর্ভুক্ত।[22]
তারাবিহ নামাযের জামাত:
তারাবিহ নামায জামাতে পড়া সুন্নতে কেফায়াহ। কোনো এলাকায় মসজিদে তারাবিহর জামাত না হলে ঐ এলাকার সবাই সুন্নত ত্যাগকারী হিসেবে গণ্য হবে। বাড়িতে একাকী তারাবিহ পড়া জায়েয, তবে জামাতের সওয়াব পাবে না। বাড়িতে জামাত করে পড়লে মসজিদে জামাত করে পড়ার সওয়াব পাবে না।[23] তারাবিহ নামায একাকী পড়ার চেয়ে জামাতে পড়া উত্তম হওয়ার ব্যাপারে ইবনে আব্দুল বার, ইবনে কুদামা ও নববী র. ইজমা নকল করেছেন।[24] তারাবিহ নামাযের জামাতে কেরাত জোরে পড়া মুস্তাহাব। ইমাম নববী র. এ ব্যাপারে ইজমা হওয়ার কথা বলেছেন।[25]
তারাবিহতে কুরআন খতম
তারাবিহতে অন্তত একবার কুরআন খতম করা সুন্নত। এক খতমের বেশি পড়লে বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে। ওমর রা. তারাবিহতে কুরআন তিনবার খতমের নির্দেশ দিয়েছেন। কাসানী র. বলেন, مَا أَمَرَ بِهِ عُمَرُ - رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ - هُوَ مِنْ بَابِ الْفَضِيلَةِ ، وَهُৱ أَنْ يَخْتِمَ الْقُرْآنَ أَكْثَرَ مِنْ مَرَّةٍ ، وَهَذَا فِي زَمَانِهِمْ ، وَأَمَّا فِي زَمَانِنَا فَالأْفْضَل أَنْ يَقْرَأَ الإْمَامُ عَلَى حَسَبِ حَال الْقَوْمِ، فَيَقْرَأُ قَدْرَ مَا لاَ يُنَفِّرُهُمْ عَنِ الْجَمَاعَةِ ؛ لأِنَّ تَكْثِيرَ الْجَمَاعَةِ أَفْضَل مِنْ تَطْوِيل الْقِرَاءَةِ ওমর রা. যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা ফজিলতের বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। এর অর্থ হলো, কুরআন একাধিকবার পূর্ণভবে খতম করা। এটি তাদের সময়ে প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু আমাদের যুগে সর্বোত্তম হলো মানুষের অবস্থা অনুযায়ী পড়া, ইমাম ততটুকু পড়বেন যা জামাআতের জন্য ভারী বা কষ্টকর না হয়। কারণ জামাআতের উপস্থিতি বাড়ানো, দীর্ঘ তেলাওয়াতের চেয়ে উত্তম।[26] হানাফি কতিপয় আলেমের মতে শবে কদরের ফজিলত পাওয়ার আশায় ২৭ রমযানে কুরআন খতম করা মুস্তাহাব। মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহতে এসেছে, وَمِنَ الْحَنَفِيَّةِ مَنَ اسْتَحَبَّ الْخَتْمَ لَيْلَةَ السَّابِعِ وَالْعِشْرِينَ رَجَاءَ أَنْ يَنَالُوا لَيْلَةَ الْقَدْرِ ‘হানাফি মাযহাবের কিছু আলেম (রমযানের) সাতাশতম রাতে কুরআন খতম করাকে মুস্তাহাব বলেছেন, এ আশায় যে তারা লাইলাতুল কদর পেয়ে যাবেন।[27] সাতাশ রমযান কুরআন খতম করলেও পরের দুই বা তিন দিন তারাবিহ পড়তে হবে। যে কোনো সূরা দিয়ে এ তারাবিহ পড়া যাবে। খতম তারাবিহ উত্তম হলেও সূরা তারাবিহ পড়া জায়েয। খতম পড়লে যদি মুসল্লি না পাওয়া যায় তাহলে সূরা তারাবিহ পড়াই উত্তম।[28]
তারাবিহ নামাযের দোয়া
তারাবিহ নামাযে নির্ধারিত কোন দোয়া নেই। প্রতি চার রাকাত পর পর বিশ্রামের সময় চুপ না থেকে যে কোনো দোয়া বা জিকির-আযকার করা সওয়াবের কাজ। কুহুস্তানী র. আমাদের অঞ্চলে প্রসিদ্ধ দোয়াটি পড়ার কথা উল্লেখ করেছেন। ফতোয়ায়ে শামীতে এসেছে, قَالَ الْقُهُسْتَانِيُّ: فَيُقَالُ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ «سُبْحَانَ ذِي الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ، سُبْحَانَ ذِي الْعِزَّةِ وَالْعَظَمَةِ وَالْقُدْرَةِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْجَبَرُوتِ، سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ، سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ، لَا إلَهَ إلَّا اللَّهُ نَسْتَغْفِرُ اللَّهَ، نَسْأَلُك الْجَنَّةَ وَنَعُوذُ بِك مِنْ النَّارِكَمَا فِي مَنْهَجِ الْعِبَادِ [29]
তারাবিহ নামাযের মোনাজাত
তারাবিহ নামায শেষে সবাই মিলে সম্মিলিত মোনাজাত করা জায়েয। আমাদের সমাজে প্রচলিত যে দোয়াটি রয়েছে তা হাদিসে বর্ণিত নেই। তবে সাধারণে দোয়া-মোনাজাত হিসেবে পড়তে কোনো দোষ নেই। বরং এটি অনেক অর্থবহ হওয়ায় পড়া উত্তম।[30] اَللّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلْكَ الْجَنَّةَ وَنَعُوْذُ بِكَ مِنَ النَّارِ يَا خَالِقَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ بِرَحْمَتِكَ يَا عَزِيْزُ يَا غَفَّارُ يَا كَرِيْمُ يَا سَتَّارُ يَا رَحِيْمُ يَا جَبَّارُ يَا خَالِقُ يَا بَارُّ اَللّهُمَّ أَجِرْنَا مِنَ النَّارِ يَا مُجِيْرُ يَا مُجِيْرُ يَا مُجِيْرُ بِرَحْمَتِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ
তারাবিহতে মাসবুকের বিধান
কারও যদি কয়েক রাকাত তারাবিহ ছুটে যায় এমতাবস্থায় ইমাম সাহেব বিতরের জন্য দাঁড়িয়ে যায় তাহলে ইমাম সাহেবের সাথে বিতর নামায পড়ার পর তা আদায় করে নিবে।[31]
তারাবিহ নামাযের কাযা
তারাবিহ নামাযের কোন কাযা নেই। ফজরের পর তা আদায় করলে নফল হিসেবে গণ্য হবে। তবে যে রাতে তারাবিহ মিস হবে তার পরের দিন অথবা রমযান মাসের মধ্যে কোন দিন আদায় করলে আশা করা যায় তা তারাবিহ হিসেবে গণ্য হবে।[32]
তারাবিহ পড়িয়ে টাকা নেয়া
ইমামতি করে টাকা নেওয়া জায়েয। কুরআন-হাদিস শিক্ষা দিয়ে, আযান দিয়ে এবং ওয়াজ করেও টাকা নেওয়া জায়েয। এগুলো ইবাদত। আর ইবাদত করে টাকা নেওয়া জায়েয না হলেও এ কাজগুলো করে টাকা নেওয়া জায়েয। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এ সময়ে ‘হাবস’ বা ‘আটকে রাখা’ হয়। এঁরা চাইলেও এ সময়ে অন্য কাজ করে রোজগার করতে পারে না। অনুরূপ তারাবিহ পড়া ইবাদত হলেও হাফেজ সাহেব রমযান মাসে এশার পর চাইলেও অন্য কোথাও রোজগারের জন্য যেতে পারে না। পুরো মাস তাকে হাবস করা (আটকে রাখা) হয়। তাই এ সময়ের বিনিময়ে তাকে মজুরি দেয়া জায়েয এবং তার জন্য মজুরি গ্রহণ করাও জায়েয। হাফেয সাহেবের জন্য তারাবিহ পড়া ইবাদা হলেও এশার পর পর পড়া আবশ্যক নয়; তিনি চাইলে মাঝ রাতে বা শেষ রাতেও পড়তে পারেন। কিন্তু হাবস থাকার কারণে তিনি তা পারেন না। এখানে তেলাওয়াত বিক্রয় করা হয় না। আজিরে খাস যেমন নির্ধারিত সময়ে নিজেকে কাজের জন্য প্রস্তুত রাখলে কাজ থাকুক বা না থাকুক মজুরি পাবেই। কারণ তাকে কর্মঘণ্টায় অন্য কোথাও রোজগার করার সুযোগ দেওয়া হয় না। রমযানে হাফেজ সাহেবগণ আজিরে খাসের ভূমিকায় থাকেন। তাই তারা তারাবিহ পড়িয়ে টাকা নিতে পারবেন। তবে কেউ যদি তেলাওয়াত বিক্রয় তথা তেলাওয়াত নামক ইবাদত বিক্রয় করার নিয়ত করে তাহলে তা জায়েয নয় এবং এর মজুরিও নেওয়া জায়েয নয়। (সাধারণত এমন নিয়ত কেউ করে না)। তবে কেউ যদি কোনো প্রকার বিনিময় ছাড়াই তারাবিহ পড়ায় তাহলে তা খুবই উত্তম কাজ।[33] আল্লামা রুহুল আমিন বশিরহাটি র. রচনাবলীর ১৩ তম খণ্ডের শুরুতে ‘খতম ও যিয়ারতের উজরতের মীমাংসা’ শিরোনামে আলোচনাটি দেখতে পারেন। মালেকী মাযহাবে উজরত আলাত তাআত তথা ইবাদতের বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয আছে।[34]
তারাবিহতে উচ্চস্বরে বিসমিল্লাহ পড়া
মুসল্লিদেরকে পরিপূর্ণ খতম শোনাতে চাইলে যে কোনো একটি সূরার শুরুতে উঁচু আওয়াজে বিসমিল্লাহ পড়তে হবে। অন্যথায় এ কারণে মুসল্লিদের খতম অপূর্ণ থেকে যাবে। কারণ বিসমিল্লাহ প্রত্যেক সূরার শুরুতে থাকলেও এটি স্বতন্ত্র একটি আয়াত।[35]
সূরা তারাবিহ
যদিও অলসতার কারণে খতম তারাবিহ বাদ দেওয়া উচিত নয় তবুও বেশি মানুষ উপস্থিতির জন্য মুসল্লিরা চাইলে সূরা তারাবিহও পড়া জায়েয। এক সূরা বারবার পড়া কিংবা নির্ধারিত কিছু সূরা দিয়ে নিয়মিত তারাবিহ পড়া অনুত্তম হলেও জায়েয। যেমন সূরা ফিল থেকে নাস প্রতিদিন পড়া কিংবা প্রতি রাকাতে/প্রত্যেক ২য় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়াও জায়েয।[36]
নাবালেগ ছেলের ইমামতিতে তারাবিহ
নাবালেগ ইমামের পিছলে তারাবিহ পড়া জায়েয নয়। তবে নাবালেগ নাবালেগের ইমামতি করতে পারবে।[37]
তারাবিহতে দেখে তেলাওয়াত
ফরয নফল তারাবিহ কোনো নামাযে কোরআন দেখে তেলাওয়াত করা যাবে না। নামায ভেঙে যাবে। মোবাইল থেকেও দেখে পড়া যাবে না কোনো নুসখা থেকেও না।[38]
মহিলাদের তারাবিহর জামাত
মহিলারা বাসা-বাড়িতে পুরুষের ইমামতিতে তারাবিহ পড়তে পারবে। তবে শুধু মহিলাদের জামাত করা (যাতে ইমাম মুক্তাদি সবাই মহিলা) মাকরূহ।[39]
রেফারেন্সসমূহ: [1]. আল-মিসবাহুল মুনীর, কাওয়াইদুল ফিকহ ২২৫, ফাতহুল কাদীর ১/৩৩৩, |
[2]. কাওয়াইদুল ফিকহ ৩৫২, আদ-দাসূকী ১/৩১৫, আল-মাজমূ’ ৪/৩০, আল-মুগনী ২/১৬৫|
[3]. আল-ইখতিয়ার ১/৬৮, রদ্দুল মুহতার ১/৪৭২, আল-আদাবী ‘আলা কিফায়াতুত তালিব ১/৩৫২, ২/৩২১, আল-ইকনা’ লিশশিরবীনী ১/১০৭, আল-মাজমূ’ ৪/৩১, মাতালিব উলিন নুহা ১/৫৬৩|
[4]. নাসাঈ: ৪/১৫৮; আল-মাজমূ’ ৪/৩১, আল-ইকনা’ ১/১০৭, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব ২/৯০|
[5]. বুখারী: ৪/২৫০, মুসলিম ১/৫২৩|
[6]. ফাতহুল কাদীর ১/৩৩৩, আল-ইখতিয়ার ১/৬৮-৬৯, আল-মুগনী ২/১৬৬, আল-মুনতাকা ১/২০৭|
[7]. আল-মাজমূ' ৪/৩৭; মাজমাউল আনহুর ১/২০২; সুবুলুস সালাম ২/১১|
[8]. বুখারী ২০০৯; মুসলিম ৭৫৯| শব্দগুলো মুসলিমের|
[9]. হাশিয়াতুজ আদাবী 'আলা কিফায়াতিয তালিব ১/৩৫২; নিহায়াতুল মুহতাজ ১/১২২|
[10]. ফাতহুল কাদীর ১/১৬৭, মাওয়াহিবুল জলীল ১/৪২৩, নিহায়াতুল মুহতাজ ১/৩৮৫-৩৮৬, আল-কুলয়ূবী ১/১২৫, তুহফাতুল মুহতাজ ১/৪৬১-৪৬২ এবং কাশশাফুল কিনা ১/২৩৩-২৩৪|
[11]. বাদায়েউস সানায়ে’ ১/২৮৮; রদ্দুল মুখতার ১/৪৭৩; রাওদুত তালিবীন ১/৩৩৪; আসনাল মাতালিব ১/২০১; কাশশাফুল ক্বিনা’ ১/৪২৬; মাতালিব উলি ন-নুহা ১/৫৬৩-৫৬৪|
[12]. আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ: (খণ্ড ২৭, পৃষ্ঠা ১৪১)
[13]. বাদায়েউস সানায়ে’ ১/২৮৮; ওমর রা.-এর আছার পূর্বে (পৃষ্ঠা ৬)-এ তাখরীজ করা হয়েছে|
[14]. হাশিয়াতুদ দুসূকী ১/৩১৫|
[15]. রদ্দুল মুখতার ১/৪৭৪|
[16]. শরহুয যারকানী ১/২৮৪|
[17]. কাশশাফুল ক্বিনা’, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২৫|
[18]. আদ-দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুখতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৭৪; আল-আদাওয়ী ‘আলা কিফায়াতুত তালিব, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩২১; আসনাল মাতালিব, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২০০; মাতালিব উলি ন-নুহা, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৬৪|
[19]. রদ্দুল মুখতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৭৪; বাদায়েউস সানায়ে’, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৯|
[20]. রদ্দুল মুখতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৭৫|
[21]. আদ-দুররুল মুখতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৭৫; বাদায়েউস সানায়ে’, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯০|
[22]. রদ্দুল মুখতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৭৩; মাওয়াহিবুল জলীল, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৭০; শরহুহ যারকানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৩; আসনাল মাতালিব, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২০৩; ফাতহুল কাদীর, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৩৪; আল-মুগনী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৭০; কাশশাফুল ক্বিনা’, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২৬|
[23]. ফতোয়ায়ে শামী: খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৪৭৩-৪৭৬|
[24]. আল-মুগনী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১২৪; আল-মাজমূ’, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩২|
[25]. আত-তিবইয়ান, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-১৩০|
[26]. ফাতহুল কাদীর, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৩৫; বাদায়েউস সানায়ে’, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৯|
[27]. আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ ২৭ / ১৪৮|
[28]. প্রাগুক্ত
[29]. রদ্দুল মুহতার: খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৪৯৬-৪৯৭|
[30]. তানযীহ ২/৩২৬; কাশফুল খাফা ১/৫৩৮|
[31]. ফতোয়ায়ে শামী: খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৪৭৩|
[32]. রদ্দুল মুখতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৭৩; কাশশাফুল ক্বিনা’, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২৬| |
[33]. আদ-দুররুল মুখতার ৬/৫৫; মাজমাউল আনহুর ফী শরহি মুলতাকাল আবহুর: ৩/৫৩৩; ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/৪৮৪; ইমদাদুল মুফতীন: পৃষ্ঠা ৩৬৫|
[34]. রওদাতুত তালিবীন: ৫/১৯১; মুগনীল মুহতাজ: ৩/৬৯
[35]. মাজমুয়াতুল ফাতাওয়া, লাখনাভী রাহ. ১/৩১৫|
[36]. হাশিয়াতুদ দাসূকী ১/৩১৫, এবং আসনাল মাতালিব ১/২০১|
[37]. খুলাসাতুল ফাতাওয়া, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৪৬
[38]. আল-বাহরুর রায়েক: ২/১৭; তাবয়ীনুল হাকায়েক: ১/১৫৯; রদ্দুল মুহতার: ২/৩৮৪|
[39]. বাদায়েউস সানায়ে ১/৩৮৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৮০|