সহীহ মুসলিম শরীফ - ইমাম মুসলিম রহঃ
المسند الصحيح لمسلم

হাদীসের অন্যতম বিশুদ্ধ গ্রন্থ হচ্ছে ছয়টি। ইসলামী পরিভাষায় এগুলো 'কুতুবে সিত্তাহ' নামে প্রসিদ্ধ। এ বিষয়ে মুসলিম উম্মাহ্ ও ইসলাম-বিশেষজ্ঞগণের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই যে, এগুলোর মাঝে সহীহ বুখারীর পরে হলো সহীহ মুসলিমের স্থান। এই মহান সংকলনটি ইমাম মুসলিমের শ্রেষ্ঠ অবদান। ইমাম মুসলিম (র) সরাসরি শাইখের কাছ থেকে শ্রুত তিন লক্ষ হাদীস থেকে বাছাই ও চয়ন করে এই বিরাট গ্রন্থখানি সংকলন করেছেন। এই গ্রন্থে তাকরার বা একাধিকবার উদ্ধৃত হাদীসসহ মোট বার হাজার হাদীস সন্নিবেশিত হয়েছে। তাকরার বাদ দিলে হাদীসবিদদের মতে হাদীসের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। ইমাম মুসলিম কেবল নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধি-বিবেচনার উপর নির্ভর করেই কোন হাদীসকে সহীহ বলে এই গ্রন্থে শামিল করেন নি, অধিকন্তু প্রতিটি হাদীসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সমসাময়িক অন্যান্য মুহাদ্দিসের সঙ্গেও পরামর্শ করেছেন। সমসাময়িক মুহাদ্দিসগণ যে হাদীসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ একমত, কেবল তা-ই তিনি এই অমূল্য গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি এটি তদানীন্তন প্রখ্যাত হাফিযে হাদীস ইমাম আবূ যুৱ'আ আর-রাযীর সম্মুখে উপস্থিত করেন। ইমাম মুসলিম (র) বলেন: আমি এই গ্রন্থখানি ইমাম আবূ যুর’আ আর-রাযীর কাছে পেশ করেছিলাম। তিনি যে হাদীস সম্বন্ধে দোষ আছে বলে ইংগিত করেছেন, আমি তা পরিত্যাগ করেছি, সেগুলো গ্রন্থে সন্নিবেশিত করিনি, আর যে হাদীস সম্পর্কে তিনি মত দিয়েছেন যে, তা সহীহ এবং এতে কোন প্রকার ত্রুটি নেই, আমি তা এই গ্রন্থে শামিল করেছি। তিনি আরো বলেন : কেবল আমার বিবেচনায় সহীহ হাদীসসমূহই আমি কিভাবে শামিল করিনি, বরং এ কিতাবে কেবল সেসব হাদীসই সন্নিবেশিত করেছি, যেগুলোর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ একমত। এভাবে দীর্ঘ পনেরো বছর পর্যন্ত অবিশ্রান্ত সাধনা, গবেষণা ও যাচাই-বাছাই করার পর সহীহ হাদীসসমূহের এক সুসংবদ্ধ সংকলন তৈরি করা হয়। এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত হাদীসসমূহের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ইমাম মুসলিম (র) নিজেই বলেন : মুহাদ্দিসগণ দুশ বছর পর্যন্ত যদি হাদীস লিখতে থাকেন, তবুও এই বিশুদ্ধ গ্রন্থের উপর অবশ্যই নির্ভর করতে হবে। ইমাম মুসলিমের এই দাবি যে কত সত্য, পরবর্তী ইতিহাসই তার প্রমাণ। আজ এগারশ' বছরেরও অধিক কাল অতিক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু সহীহ মুসলিমের সমান কিংবা তা থেকে উন্নত মর্যাদার কোন গ্রন্থ প্রণয়ন করা হয় নি। আজও এর সৌন্দর্য ও বিশুদ্ধতা বিশ্বমানবকে বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন আলো দান করছে। এই গ্রন্থের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে তিনি এত সতর্ক ছিলেন যে, মতন ও সনদ ছাড়া আর কিছুই তিনি এতে সন্নিবেশিত করেন নি। এমনকি নিজের তরফ থেকে তারজমাতুল বাব বা হাদীসের শিরোনাম পর্যন্ত লিখেন নি। তবে এমনভাবে তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এটির বিন্যাস করেছেন যে, অতি সহজেই শিরোনাম নির্ধারণ করা যায়। বর্তমানে যে শিরোনাম দেখা যায় তা মুসলিম শরীফের প্রখ্যাত ব্যাখ্যাতা ইমাম নববীর (৬৭৬হি:) সংযোজন। মুহাদ্দিসগণ এর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে একমত। শুধু তাই নয়, পরবর্তীকালের কয়েকজন যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস বুখারী শরীফের ওপর মুসলিম শরীফকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস কাযী ইয়ায (র) বলেন, আমার উস্তাদ প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণ বুখারী শরীফ অপেক্ষা মুসলিম শরীফকেই অগ্রাধিকার দিতেন। আমি আবূ আলী নিশাপুরীকে (যাঁর মত হাদীসের বড় হাফিয আমি আর একজনও দেখিনি) এই কথা বলতেও শুনেছি যে, আকাশের তলে ইমাম মুসলিমের হাদীস গ্রন্থ অপেক্ষা বিশুদ্ধতর কিতাব আর একখানিও দেখিনি। এ সম্পর্কে বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফিযুল হাদীস আবদুর রহমান ইবন আলী ইয়ামানী (র) বলেন : কিছু লোক এসে বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ সম্পর্কে আমার সামনে বিতণ্ডা শুরু করে । বুখারী শরীফ শ্রেষ্ঠ না মুসলিম শরীফ শ্রেষ্ঠ। আমি বললাম : বিশুদ্ধতার বিচারে যেমন বুখারী শরীফ মর্যদাসম্পন্ন, তেমনি অভিনব বিন্যাস শৈলী ও পরিবেশনা কৌশল বিচারে সহীহ্ মুসলিম অতুলনীয়। হাফিযুল হাদীস ইব্‌ন কুরতুবী (র) সহীহ্ মুসলিম সম্পর্কে লিখেন : ইসলামে এরূপ আর একখানি গ্রন্থ নেই। ইমাম মুসলিমের সংকলিত এই হাদীস গ্রন্থখানি তাঁর নিকট থেকে বহু ছাত্রই শ্রবণ করেছেন এবং তাঁর এটি বর্ণনাও করেছেন। কিন্তু যার সূত্রে এই গ্রন্থখানির বর্ণনাধারা সর্বত্র সাম্প্রতিক যুগ পর্যন্ত চলে আসছে, তিনি হলেন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খ আবূ ইসহাক ইব্রাহীম ইবন মুহাম্মাদ ইবন সুফিয়ান নিশাপুরী (র)। তিনি ৩০৮ হিজরী সনে ইন্তিকাল করেন। এই ইব্রাহীম ইবন মুহাম্মদ ইবন সুফিয়ানের সঙ্গে ইমাম মুসলিমের এক বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তিনি সব সময়ই ইমাম মুসলিমের সাহচর্যে থাকতেন ও তাঁর কাছে হাদীস অধ্যয়ন করতেন। আল্লাহর দরবারে এই মহান গ্রন্থটি যে কতটুকু মকবূল নিম্নোক্ত বর্ণনাটি তার প্রমাণ। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আলী আয-যাগওয়ানী (র)-এর মৃত্যুর পর স্বপ্নে একজন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল : আপনি কিসের ওসীলায় নাজাত পেয়েছেন ? তিনি তখন তাঁর হাতে রাখা মুসলিম শরীফের একটি কপির দিকে ইংগিত করে বললেন : এই মহা গ্রন্থখানির ওয়াসীলায় আমি নাজাত পেয়েছি।