সুনানে আবু দাউদ (রহ)
ইমাম সাহেব কখন এ গ্রন্থখানার সংকলন সম্পন্ন করেন কোথাও তার সুস্পষ্ট
তথ্য পাওয়া যায় না। তবে তিনি তাঁর এ গ্রন্থ প্রণয়ন সম্পন্ন করে তা তাঁর
শায়খ ও যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ ইমাম আহমাদ ইব্ন হাম্বল (রহ)-এর খেদমতে পেশ
করেন। তিনি গ্রন্থখানার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। আর ইমাম আহমাদ (রহ) ২৪১
হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইমাম আবু দাউদ (রহ) ৩৯ বছর
বয়সের পূর্বেই তাঁর সূনান গ্রন্থের সংকলন সম্পন্ন করেন।
‘সুনান’ গ্রন্থ হাদীছ সাহিত্যের একটি ঐশ্বর্যপূর্ণ শাখা। ইসলামের
ইতিহাসের অতি প্রাথমিক কাল থেকেই মুহাদ্দিছগণ মাগাযী-এর তুলনায় আহকাম এবং
উপদেশমূলক হাদীছ সংগ্রহ ও সন্নিবেশের প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁদের
মতে মাগাযীর বাস্তব তাৎপর্য ও আবশ্যকতা তুলনামূলকভাবে কম। অপর দিকে নবী
করীম (স)-এর জীবনের অপরাপর দিক যেমন, তাঁর উযু, গোসল, নামায এবং হজ্জ-এর
পদ্ধতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিবাহ-শাদি ইত্যাদি সম্পর্কিত আদেশ-নিষেধ
ঈমানদারগণের বাস্তব জীবনের জন্য একান্ত অপরিহার্য বিষয়। এ কারণে হিজরী
তৃতীয় শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে মুহাদ্দিছগণ আহকাম সম্পর্কিত হাদীছসমূহ
সংকলনের প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করেন। আর এ ধরনের হাদীছ গ্রন্থকেই বলা হয়
সুনান গ্রন্থ। ইমাম আবু দাউদ (রহ) ছিলেন এরূপ হাদীছ গ্রন্থ সংকলকগণের
পথিকৃত।
ইমাম আবু দাউদ (রহ) এমন একটি হাদীছ গ্রন্থ সংকলন করেন যাতে এমন সব
হাদীছ সংকলিত হয়েছে যেগুলো ইমামগণ তাঁদের নিজ নিজ মাযহাবের পক্ষে দলীল
হিসাবে গ্রহণ করেছেন।
এ প্রসংগে ইমাম আবু দাউদ (রহ) বলেনঃ আমার এই কিতাবের মধ্যে ইমাম মালিক,
ইমাম সুফিয়ান সাওরী, ইমাম শাফিঈ (রহ) প্রমুখ ইমামগণের মাযহাবের ভিত্তি
বর্তমান রয়েছে। 'সুনান' গ্রন্থসমূহের মধ্যে সুনানে আবু দাউদ সর্বশ্রেষ্ঠ।
সকল যুগের আলেম ও ফিক্হ শাস্ত্রবিদগণ এ গ্রন্থের প্রশংসা করে আসছেন। আমরা
ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ইমাম আবু দাউদ (রহ) গ্রন্থখানি সংকলন করে ইমাম
আহমাদ ইব্ন হাম্বল (রহ)-এর নিকট পেশ করলে তিনি তা অনুমোদন করেন এবং একটি
উত্তম গ্রন্থ বলে মন্তব্য করেন।
আবু সাঈদ ইবনুল আরাবী বলেন, "যার নিকট আল-কুরআন এবং ইমাম আবু দাউদ-এর
কিতাবখানি রয়েছে তার এ দুটির সাথে আর কোন জ্ঞানের প্রয়োজন নেই।”
আল্লামা আস-সাজী (রহ) বলেন, "আল্লাহর কিতাব আল-কুরআন ইসলামের মূল
ভিত্তি আর ইমাম আবু দাউদ (রহ)-এর হাদীছ সংকলনখানি ইসলামের ফরমান স্বরূপ।”
আল্লামা খাত্তাবী (রহ) বলেন, “দীনী জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এর মত আর
কোন গ্রন্থ রচিত হয়নি। আর এ গ্রন্থখানা বিন্যাসভংগীর দিক থেকে অতি
সুন্দরভাবে সজ্জিত এবং বুখারী ও মুসলিম-এর তুলনায় তাতে ফিক্হ শাস্ত্রের
অধিক জ্ঞান সন্নিবেশিত হয়েছে।” ইমাম আবু দাউদ (রহ)-এর এ গ্রন্থখানা জনগণের
মাঝে কি পরিমাণ সমাদৃত হয়েছিল এর প্রতি ইংগিত করে তাঁর ছাত্র হাফিজ
মুহাম্মাদ ইব্ন মাখলাদ (মৃ. ৩১১ হি.) বলেন, "ইমাম আবু দাউদ (রহ) তাঁর
সুনান গ্রন্থখানা প্রণয়ন সম্পন্ন করে জনগণকে পাঠ করে শুনালে তা তাদের নিকট
(কুরআন মজীদের মতই) অনুসরণীয় পবিত্র গ্রন্থ হয়ে গেল।”
এই গ্রন্থের ফিক্হ শাস্ত্রীয় বৈশিষ্ট্যের প্রতি লক্ষ্য করে হাফিজ আবু
জাফর ইব্ন জুবাইর আল-গারনাতী (মৃ. ৭০৮/১৩০৮) বলেন, “ফিক্হ সম্পর্কিত
হাদীছসমূহ সামগ্রিক ও নিরংকুশভাবে সংকলিত হওয়ায় সুনানে আবু দাউদ-এর যে
বিশেষত্ব তা সিহাহ সিত্তার অপর কোন গ্রন্থের নেই।”
ইমাম গাযালী (রহ)-ও এ গ্রন্থের আহকাম সম্পর্কিত হাদীছসমূহের প্রতি
লক্ষ্য করে বলেন, “আহকামের হাদীছসমূহ লাভ করার জন্য একজন মুজতাহিদের পক্ষে এ
গ্রন্থখানাই যথেষ্ট।”