৫৩৫
রাগের মাথায় তালাক
প্রশ্নঃ ৫৩৫. আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ,
সম্মানিত মুফতি সাহেব,
আমি একজন মুসলিম। অজ্ঞতা ও চরম রাগের কারণে আমার দাম্পত্য জীবনে একটি গুরুতর বিষয় ঘটেছে। আমি শরিয়তের সঠিক ফয়সালা জানতে চাই। অনুগ্রহ করে সম্পূর্ণ ঘটনা বিবেচনা করে জানাবেন—আমাদের মাঝে তালাক কার্যকর হয়েছে কি না।
🔹 ঘটনার বিবরণ:
আমি আমার স্ত্রীর সাথে বিবাহের সময় আমার স্ত্রীর কাবিনের টাকা থেকে আমার শাশুড়ী খরচ করেন। এর পর পরবর্তীতে আমার শ্বশুরের অপারেসনের কথা বলে আরও টাকা খরচ করার জন্য নেয় কাবিনের টাকা থেকে। পরবর্তীতে অপারেশন করানো হয়নি।ঐ টাকা অপারেসন না করিয়ে আমার স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই অন্য আত্মীয়কে ধার দেয়।এতে আমি কষ্ট পাই।যদিও আমার এক বিন্দুপরিমান কোনো টাকা পয়সার প্রতি লোভ নেই। একদম অন্তর থেকে।তো এই রাগ ধরে আমি আমার স্ত্রীর সাথে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ি।সেই সময় আমি তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছা ছাড়াই শুধু ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে ফোন কানে নিয়ে কথা বলতে বলতে বলছিলাম—তালাক দিতে কী কী লাগে ইত্যাদি। ভয় দেখানোর জন্য ইউটিওবে তালাকের নিয়ম সার্চ করছিলাম।তো এতে আমার স্ত্রী ভয় পেয়ে তার বড় বোনের বাসায় চলে যায়।
পরে তার বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ হলে তার মা নিজেই আমাকে গিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে আসতে বলেন, এবং আমার স্ত্রীও সম্মতি দেয় গিয়ে নিয়ে আসতে। কিন্তু বড় বোনের কথায় সে তখন আসেনি।
এরপর আমি চরম রাগান্বিত ও মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় ছিলাম। সেই অবস্থায় ফোন কলে একবার তালাকের শব্দ উচ্চারণ হয়। আমি তখন কী বলছি তা বুঝতে পারছিলাম না, এবং স্ত্রীকে ছাড়ার কোনো নিয়ত আমার ছিল না।
এরপর আবার আমি তাকে আনতে যাই। সেখানে আমাকে প্রায় ৩ ঘণ্টা দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। সেই সময় রাগের মাথায় আমি বলছিলাম—“আমার সাথে চলো, না হলে এখনই তালাক দেবো।”
এক পর্যায়ে অজান্তে মুখ ফসকে তিন তালাকের শব্দ বের হয়ে যায়। তখনও আমার কোনো তালাক দেওয়ার নিয়ত ছিল না এবং তালাক সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞানও ছিল না।
নিচে নেমে আসার পর আমি বুঝতে পারি এমন কথা আমার মুখ দিয়ে বের হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে অনুতপ্ত হয়ে আবার স্ত্রীকে নিতে যাই। তখন সে অচেতন হয়ে পড়লে দরজা খোলা হয়। আমি তাকে বুঝিয়ে পূণরায় নিয়ে আসতে চাইলে সে রাজি হলেও তার বোন ও মায়ের কথায় আবার আসেনি।
এরপর তার বাবা-মা নিজেরাই তাকে আমার বাসায় দিয়ে যায়।
এরপর আমরা:
প্রায় ১৫ দিন একসাথে সংসার করেছি
স্বাভাবিক স্বামী-স্ত্রীর মতো জীবন যাপন করেছি
তার বাবা-মা আমার গ্রামের বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে এসেছেন।ঐ ঝগড়ার পর থেকে আমার শ্বশুর শাশুরি এবং স্ত্রীর নিকট প্রতিদিন ফোনে ক্ষমা চেয়েছি।এবং আর কখনো না করার তীব্র প্রতিজ্ঞা করেছি।
শবে বরাতের রাতে আমরা দুজনই অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেছি,একসাথে নামাজ পরে একে অপর কে ধরে কেঁদেছি আমাদের ভুলের জন্য। এবং আর এমন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি
এরপর আমি ব্যবসার কাজে বিদেশে আসি। আমাকে এয়ারপোর্টে বিদায় দিয়ে স্ত্রী আমার বাবা মা সহ তার বাবার বাড়িতে যায়। সেখানে গিয়ে হঠাৎ তার বাবা-মা ও চাচারা আমার বাবা-মাকে ডেকে বলেন—“সংসার হবে না, তালাক হয়ে গেছে।”
বর্তমানে আমার স্ত্রীকে বোঝানো হচ্ছে:
তালাক হয়ে গেছে
এখন একসাথে থাকা হারাম
যদি সে আমার কাছে ফিরে আসে তবে পরিবার তাকে ত্যাগ করবে
অথচ এই ঘটনার পর ১৫ দিন সংসার হয়েছে এবং তখন কেউ তালাক কার্যকর বলেনি।
এবং বর্তমানে আমার স্ত্রী এটা বিশ্বাস করা শুরু করেছে তালাক হযে গেছে।এবং আমার পূর্ববর্তী আচরনের জন্য সে আর ফিরতে চাচ্ছে না।ভয় পাচ্ছে।
❓ আমার প্রশ্ন:
চরম রাগ, নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা ও তালাকের নিয়ত ছাড়া উচ্চারিত তালাক কি শরিয়তে কার্যকর হয়?
একাধিকবার রাগের মাথায় মুখ ফসকে বের হওয়া শব্দ কি তালাক হিসেবে গণ্য হয়?
তালাক যদি কার্যকর হতো, তবে পরবর্তীতে ১৫ দিন একসাথে সংসার করা, দাওয়াত-মিলন—এসবের শরিয়তগত হুকুম কী?
এই অবস্থায় আমাদের দাম্পত্য সম্পর্ক কি এখনো বৈধ আছে, নাকি নতুন কোনো পদক্ষেপ (যেমন—নতুন আকদ) প্রয়োজন?
এই তালাক কি কার্যকর হয়েছে নাকি এক তালাক বলে গণ্য হবে?
আমি আল্লাহকে ভয় করি এবং হারাম সম্পর্ক রাখতে চাই না। আবার অজ্ঞতার কারণে বৈধ সম্পর্ক ভেঙেও ফেলতে চাই না।
অনুগ্রহ করে কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহের আলোকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিলে কৃতজ্ঞ থাকবো।
ওয়াসসালাম
একজন অনুতপ্ত বান্দা
রাগান্বিত অবস্থায় তালাক দিলেও শরীয়তে তালাক পতিত হয়ে যায়। অতএব আপনি রাগের মাথায় স্ত্রী কে যে তালাক দিয়েছিলেন তা পতিত হয়ে গেছে।
এবং পরবর্তীতে আপনারা যে ১৫ দিন সংসার করেছেন তা ইসলামী শরীয়তে হারাম হয়েছে। এর জন্য আল্লাহর কাছে তওবা ইস্তেগফার করতে হবে।
বর্তমানে অনুতপ্ত হয়ে স্ত্রীকে নিয়ে আসার সুযোগ নেই। স্ত্রীর পরিবারের সিদ্ধান্তটা সঠিক।
সূরা বাকারা ২২৯ ,২৩০